Md.Arafat Hossain
দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার এক স্নিগ্ধ মোহনার নাম নূরানী শিক্ষা পদ্ধতি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই অমর ঘোষণা—‘তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে কুরআন মাজিদ শেখে এবং শেখায়’—এই আসমানি বাণীকে পাথেয় করেই শায়খুল কুরআন আল্লামা কারী বেলায়েত হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি বাংলাদেশে বিশুদ্ধ কুরআন চর্চার এক নতুন প্রভাত এনেছিলেন। তাঁর সেই সোনালী স্বপ্ন ছিল এমন এক প্রজন্ম গড়া, যাদের অন্তরে থাকবে আল্লাহর কালামের নূর এবং মস্তিষ্কে থাকবে আধুনিক জ্ঞানের দীপ্তি। সেই পবিত্র লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজকুঞ্জরা ফাজিল মাদরাসার নূরানী বিভাগ ২০০৮ সাল থেকে নিরলসভাবে কাজ করে আজ অত্র অঞ্চলের এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।আমাদের শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো আরবি ভাষা ও বিশুদ্ধ কুরআন চর্চা। নূরানী পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়মে আমরা প্রতিটি শিশুকে অত্যন্ত অল্প সময়ে আরবির প্রতিটি হরফের সঠিক উচ্চারণ বা মাখরাজ শিখিয়ে থাকি। কেবল কুরআন তিলাওয়াত নয়, বরং তাজবিদসহ বিশুদ্ধ উচ্চারণ এবং শৈল্পিক আরবি লেখার ওপর আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করি। প্রিয়নবী (সা.)-এর নির্বাচিত ৪০টি হাদিস অর্থসহ মুখস্থ করানোর পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের সকল মাসনুন দোয়া শিশুদের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া হয়। ফলে এই পবিত্র আঙিনায় একজন শিক্ষার্থী কেবল অক্ষর চেনে না, বরং তার অন্তরে আরবির মাধুর্য ও কুরআনের প্রতি গভীর প্রেম জাগ্রত হয়।মাদরাসার অন্যতম প্রধান বিশেষত্ব হলো এর নিবিড় ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা। শৈশবের কাঁচা হাতে কলম ধরতে শেখানোর পবিত্র দায়িত্বটি আমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরাই পরম মমতায় কাঁধে তুলে নেন। শিশু ও প্রথম শ্রেণির প্রতিটি শিক্ষার্থীর ডায়েরি ও খাতায় আরবি, বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের ‘বাড়ির কাজ’ শিক্ষকরা নিজ হাতে লিখে দেন। তাঁদের এই সযত্ন লেখা দেখে দেখে শিশুরা যখন বর্ণমালা সাজায়, তখন তাদের অক্ষরগুলো হয়ে ওঠে মুক্তোর মতো ঝকঝকে। বলা এবং লেখার এই সমন্বিত শৈল্পিক অনুশীলনের ফলে তাদের লেখার গতি ও শুদ্ধতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক বেশি হয়, যা পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাজীবনে তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে।নূরানী শিক্ষা পদ্ধতি কেবল একটি কিতাবি সিলেবাস নয়, এটি একটি আদর্শ জীবন গড়ার কারিগর। এখানে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় মাসয়ালাসহ পূর্ণাঙ্গ নামাজ ও ইমামতি করার যোগ্যতা অর্জন করে। জুমার খুতবা এবং ঈদের নামাজ পড়ানোর মতো সাহসী শিক্ষা তাদের ভেতর আগামীর নেতৃত্ব জাগিয়ে তোলে। বিশেষ করে জানাজা হলো সমাজের একটি বড় ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব; নূরানী পদ্ধতি সেই শূন্যতা পূরণ করে। একজন সন্তান যেন তার বাবার শেষ বিদায়-বেলায় অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেই ইমামের আসনে দাঁড়িয়ে জানাজা পড়াতে পারে—সেই দোয়া ও নিয়মগুলো এখানে নিখুঁতভাবে শেখানো হয়। বর্তমানে এই বিভাগে ২৫০-এরও অধিক কোমলমতি শিক্ষার্থী ৬ জন দক্ষ শিক্ষক ও ১ জন স্নেহময়ী শিক্ষিকার তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠছে।আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নূরানী পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি শিশু শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ বছরের শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং ভূগোল ও সাধারণ জ্ঞান এমন উচ্চমানে পড়ানো হয় যে, এই কোর্স শেষ করে একজন শিক্ষার্থী সরাসরি যেকোনো আধুনিক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তির পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করে। ভৌগোলিক জ্ঞানের মাধ্যমে তারা আমাদের দেশ ও বিশ্ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করে। আমাদের শিক্ষার্থীরা তৃতীয় শ্রেণি শেষ করে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান অর্জন করে। এমনকি অনেকে এই ৪ বছরেই নিজেকে এমনভাবে তৈরি করে ফেলে, যাতে সে অনায়াসেই চির সৌভাগ্যের ‘হিফজুল কুরআন’-এর পবিত্র আসরে নাম লেখাতে পারে।নিজকুঞ্জরা ফাজিল মাদরাসার নূরানী শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর বার্ষিক মাহফিলে তাদের অর্জিত শিক্ষার এক বিস্ময়কর প্রদর্শনী পেশ করে। মঞ্চের আলোয় যখন এই ছোট্ট শিশুরা দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরার অনুবাদ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় সাবলীলভাবে উপস্থাপন করে, তখন উপস্থিত সুধীজন ও অভিভাবকরা বিস্ময়ে বিমোহিত হন। এছাড়াও তাদের কণ্ঠে সুমধুর হামদ-নাত, জানাজার নামাজের বাস্তব মহড়া এবং সুনিপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে ইসলামী নাটিকা ফুটিয়ে তোলার দৃশ্য উপস্থিত সবার চোখে আনন্দের অশ্রু এনে দেয়। এই খুদে প্রতিভাগুলো অত্র অঞ্চলের প্রতিটি হৃদয়ে ঈমানি আবেশ ও শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ ছড়িয়ে দিচ্ছে।পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে বইছে আনন্দের ফল্গুধারা। প্রতি বছর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে আয়োজন করা হয় মনোরম শিক্ষাসফর। আর বছরের শুরুতে যখন কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে মেধা পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়, তখন তাদের চোখের ঝিলিক আগামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। আপনার সন্তানকে একজন নৈতিক, আদর্শবান ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে নিজকুঞ্জরা ফাজিল মাদরাসার এই নূরানী আঙিনা হতে পারে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার এক মজবুত ভিত্তি। আপনার প্রিয় সন্তানের সুন্দর আগামীর জন্য আজই আমাদের এই আলোকিত আঙিনায় যুক্ত হোন।মো: আরাফাত হোসেন (নাইম)নূরানী সহকারী শিক্ষক, নিজকুঞ্জরা ফাজিল মাদরাসা।
12 Comment
Md.Arafat Hossain
নিজকুঞ্জরা ফাজিল মাদরাসা আদর্শ মানুষ গড়ার এক সুরভিত আঙিনা
Like ReplyMd.Arafat Hossain
নিজকুঞ্জরা ফাজিল মাদরাসা আদর্শ মানুষ গড়ার এক সুরভিত আঙিনা
Like Reply